আফসোস! ম্যাজিস্ট্রেট ছেলেকে দেখে যেতে পারলেন না মা

ইন্জিনিয়ারিং এবং মেডিক্যাল নিয়ে দোটানায় থাকায় ভালোভাবে প্রস্তুতি নিতে পারেননি। তারপরও ভালো প্রস্তুতি ছাড়াই চান্স পেয়ে যান নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড টেলিকমিউনিকেশন ইন্জিনিয়ারিং বিভাগে। বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার পর থেকে ব্যাচ পড়াতেন আর বড় ভাইয়ের সহযোগিতাও ছিল। তা নিয়েই পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে বিতর্ক করতেন এবং জড়িত ছিলেন বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে। প্রথম শ্রেনী পেয়ে স্নাতক সম্পন্ন করে মাস্টার্সে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইআইটিতে। স্নাতক শেষে একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে প্রোগ্রামার হিসেবে যোগদেন। কিন্তু বড় ভাই ডা. অনুপম মজুমদারের অনুপ্রেরণায় প্রচণ্ড ইচ্ছা জাগে সিভিল সার্ভিসে আসার। তখন ৩৭তম বিসিএস প্রিলিমিনারির জন্য হাতে আছে প্রায় চার মাস। এসময় চাকরি ছেড়ে দেন এবং বন্ধুবান্ধবদের সাথে আড্ডাবাজি সবকিছু থেকে গুটিয়ে নেন নিজেকে।

পুরোদমে প্রস্তুতি নিতে থাকেন প্রিলিমিনারির জন্য। সকাল ১০টা থেকে রাত ২ থেকে ৩ টা পর্যন্ত দৈনন্দিন কাজ ছাড়া বাকি সময় টানা পড়াশোনা করতে থাকেন। নিজের প্রস্তুতির অভিজ্ঞতা থেকে বিসিএস পরীক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘প্রস্তুতি শুরুর আগে একটা মাইলফলক ঠিক করে সে অনুযায়ী নিয়মিত পড়তে হবে। সব টপিক বিস্তারিত পড়লে ভাইভাতেও কাজে লাগবে। প্রত্যেকটি বিষয়ের জন্য আগে থেকেই সময় নির্ধারণ করে নিতে হবে। কোন একটি বিষয় নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ না করতে পারলে অন্য বিষয়ের জন্য নির্ধারিত সময় কমিয়ে অসম্পূর্ণ বিষয়টি শেষ করতে হবে’। প্রিলিমিনারিতে উত্তীর্ণ হওয়ার পর লিখিত পরীক্ষার জন্য খুব অল্প সময় পেলেও সে সময় অসুস্থ মায়ের সেবা করার পাশাপাশি লিখিত পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে হয় তাকে। বিসিএস মহাযুদ্ধের শেষ প্রান্তে এসে কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয় নিরুপমকে।

ভাইভার ঠিক আগ মুহূর্তে অক্টোবরের ২ তারিখে তাদের রেখে না ফেরার দেশে চলে যান জন্মদাত্রী মা শৈবলনী মজুমদার। দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয় নিয়ে নিরুপম ভাইভার প্রস্তুতি চালিয়ে যেতে থাকেন। সবশেষে ভাইভা দিয়ে নিজের পছন্দের প্রশাসন ক্যাডারে উত্তীর্ণ হন। কিন্তু যার কথা চিন্তা করে সবসময় বড় হওয়ার চেষ্টা করে যেতেন; সেই মমতাময়ী মা নিরুপমের সফলতা দেখার আগেই চির বিদায় নিয়ে চলে যান। প্রশাসনিক ক্যাডারে আসা সম্পর্কে বলেন, ‘দেশ ডিজিটালাইজেশন হচ্ছে সামনে তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে তাই ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে প্রশাসনে এসেছি যেন প্রশাসনকে এদিকে এগিয়ে নিতে পারি। আর একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে দরিদ্র মানুষদের কাছ থেকে সহযোগিতা করতে পারি।

প্রশাসনিক ক্যাডারে সুযোগ পাওয়ার অনুভূতি সম্পর্কে নিরুপম বলেন, ‘এটা হচ্ছে একটা অসাধারণ অনুভূতি। দরিদ্র পরিবারের ছেলে হয়ে এই অর্জন সহজ ছিল না। এখন সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়লে চোখে আনন্দের অশ্রু চলে আসে। আমার মা আমার জন্য অনেক কষ্ট করেছেন। উনি এমন একজন মানুষ ছিলেন যার দুইটা বা তিনটার বেশি শাড়ি ছিল না। যে প্রায় সময় নিজে না খেয়ে আমাদের খাওয়াতেন। প্রতিটা ধাপে আমার মা সবসময় প্রেরণা জুগিয়ে আমাকে এগিয়ে নিয়েছেন। তবে অনেক প্রাপ্তির মাঝে একটা অপ্রাপ্তি হচ্ছে আমার মা সফলতা দেখে যেতে পারেননি’। লেখক: মু. ফারহান, শিক্ষার্থী, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ এন্ড লিবারেশন ওয়্যার স্টাডিজ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *